শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

শ্রমিক অসন্তোষ কাম্য নয়

আগস্ট বিপ্লবের পর সারাদেশেই শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।  সে ধারাবাহিকতায় দেশের উৎপাদনমুখী বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। পোশাক খাতে হামলা ও ভাঙচুরের কারণে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। দাবি মেনেও পরিস্থিতি হচ্ছে না স্থিতিশীল। পাশাপাশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে রপ্তানিও। অচল হয়ে পড়েছে অনেক কারখানা। ফলে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের অনেকেই জেলে। কেউ কেউ পলাতক রয়েছেন। বেতন দিতে পারছে না অনেক কারখানার মালিকপক্ষ। যার প্রভাব  পড়ছে সামগ্রিক ব্যবসার ওপর। এতে নতুন করে চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না হলে সামনে দুর্ভোগে পড়তে হবে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা। এ ছাড়া সুদ ব্যয়ের সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি চাপে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। সময়মতো ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। এতে অনেকেই খেলাপি হয়ে পড়ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। এ সময় পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন কারখানায় অসন্তোষ চলছে। এতে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। নতুন অর্ডার দেয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন তারা। আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ে একটা অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। মূলত, পোশাক শিল্প দেশের প্রধান রপ্তানি খাত এবং অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। এ খাতকে কোনোভাবেই অস্থিতিশীল হতে দেয়া উচিত নয়। অবিলম্বে এর অবসান হওয়া উচিত বলে মনে করেন আত্মসচেতন মহল। কিন্তু এক্ষেত্রে অচলাবস্থা এখনো দূর করা সম্ভব হয়নি।

কারণ, দেশের ব্যবস্থা বাণিজ্য এখনো আওয়ামী প্রভাবেই রয়ে গেছে। আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেশের সবচেয়ে সমালোচিত এস আলম গ্রুপ। গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ সাইফুল আলম। সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এদের মধ্যে একজন। তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন। সাদ মুসা গ্রুপের মুহাম্মদ মোহসিন। এ ছাড়া বিতর্কিত ব্যবসায়ী চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ও ব্যাংক মালিকদের নেতা নজরুল ইসলাম মজুমদার। এ ছাড়া আরও অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী কর্ণধার পলাতক ও জেলে রয়েছেন।

কারখানা মালিকরা বলছেন, উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ভোগ্যপণ্যের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে আমদানিকারক দেশগুলোতে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে সমস্যায় পড়ছেন রপ্তানিকারকরা। শুধু তাই নয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগের কারণে ব্যবসায়ীরা কারখানা বন্ধ করে দেয়ায় শ্রমিকরাও চাকরি হারাতে বসেছেন অনেকেই। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও অপরাধীদের দমনে যথাযথ পদক্ষেপের অভাব দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তুলবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। যা কারো কাম্য নয়।

বিজিএমইএ সূত্র জানায়, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর শিল্পাঞ্চলের ‘নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখা’ এবং ‘প্রতিদ্বন্দ্বিদের নিয়ন্ত্রণ নিতে না দেয়ার চেষ্টার কারণেই অশান্ত তৈরি পোশাক শিল্পাঞ্চল। বিক্ষোভ করেছেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিক। পোশাক শিল্পাঞ্চল নবীনগর, চন্দ্রা, বাইপাইল, আবদুল্লাপুর, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দীর্ঘ ৩০ কিলোমিটার যানজটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে উত্তরবঙ্গের যাত্রীরা। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হস্তক্ষেপে এসব অঞ্চলে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে হয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৪শে সেপ্টেম্বর পোশাক শ্রমিকদের হাজিরা বোনাস ২২৫ টাকা বাড়ানোসহ শ্রমিকদের ১৮টি দাবি মেনে নেয় মালিকপক্ষ। শিল্পাঞ্চলে ফিরে আসে কর্মচাঞ্চল্য। এরপর সব পোশাক কারখানা চালুর ঘোষণা দেয়া হয়। ফলে গত সপ্তাহে সহিংসতা ও অস্থিরতার তীব্রতা কিছুটা কমলেও এ সপ্তাহে আবারো আন্দোলন শুরু করেছে শ্রমিকরা। আবারো শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হওয়ায় এর পেছনে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠে। যা সার্বিক পরিস্থিতিকে জটিল ও অশান্ত করে তুলেছে।

বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসর্‌স এসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ৫ই আগস্টের পর শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন অংশে অস্থিরতা দেখা দিলেও তারা তা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। শিল্প ও অর্থনীতির স্বার্থে সরকারের উচিত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, তা না হলে রপ্তানি ও স্থানীয় বাজারে মারাত্মক প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন। রপ্তানিকারকদের একাংশ দাবি করছে, যদি নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেয় তাহলে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পণ্য রপ্তানি করতে সমস্যায় পড়তে হবে। বিশ্বব্যাপী ক্রেতারা আমাদের ওপর আস্থা হারাবে। তাই কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের এখনই সময়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক কারখানায় সাবেক সরকারের সংশ্লিষ্ট লোকজন মালিক। সেখানে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ফলে বেতন পরিশোধ হয়নি। আবার কিছু কারখানায় ব্যবসায় ভালো যাচ্ছিল না গত এক বছর ধরেই। ২/à§© মাস বকেয়া পড়ে গেছে। এ থেকেই এবারের আন্দোলনের সূত্রপাত। তারা বলছেন, এতদিন গাজীপুর-আশুলিয়া এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ বা এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ মূল ভূমিকা রাখতো। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশের পুরো কাঠামোই ভেঙে পড়ায় এক মাস ধরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। তবে তারা আশা করছেন দ্রুতই তারা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে শুরু করবে। 

আমাদের তৈরি খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অতি উল্লেখযোগ্য খাত। মূলত, এই খাতই জাতীয় অর্থনীতিতে জীবনী শক্তি দিয়ে থাকে। তাই এই খাতে শ্রমিক অসন্তোষ কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে পোশাক খাত বৈদেশিক বাজার হারাতে পারে বলে মনে  করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই যেকোন মূল্যে শ্রমিক অন্তোষের বিষয়টির যৌক্তিক সমাধান করতে হবে। যারা এই খাত নিয়ে ষড়যন্ত্র করছেন বা যারা পতিত স্বৈরাচারের প্রতিভূ হিসাবে কাজ করছেন তাদের ব্যাপারেও দেখাতে হবে শূণ্য সহনশীলতা। আর শিল্প সেক্টরে শ্রমিক অসন্তোষ কোন ভাবেই কাম্য নয়। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ